দিকে দিকে শিশুনিধনের, নিষ্পাপের হত্যার খবর আসছে। খবরের কাগজ আর সহ্য হয় না, টেলিভিশনের সংবাদ আর সহ্য হয় না। সর্বংসহা হওয়ার সাধনায় মত্ত এখন বাংলাদেশ। আর পারছি না বলে বলেও আসলে ঠিকই পারছি। কিছুই বন্ধ নেই। সব যেমন চলত তেমনই চলছে, চলছে নির্বিকার নির্বিচার নীরবতা। ওদিকে ফেসবুকে সেলফির বাহার, ইগোর আহ্লাদ। নিজেদের সুন্দর আর সম্পদবান বানাতে গিয়ে এক কুৎসিত বাস্তবতায় এসে ঠেকেছি সবাই। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘এরা সুখের লাগি করে প্রেম প্রেম মেলে না’। এই সব সুখ ম্লান হয়ে যায় মা নাজমা আর শিশু সুরাইয়ার নতুন জীবন পাওয়ার হাসিতে। বৃহস্পতিবারের প্রথম আলোয় প্রকাশিত সেই তৃপ্ত মায়ের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা গর্বিত চিকিৎসকদের ছবিটাও একধরনের সেলফিই। জীবন বাঁচাতে একসঙ্গে দাঁড়িয়েছে দেশবাসী; এ রকম এক ছবি, এ রকম এক সেলফি আমরা তুলতে পারব কবে? নাকি আত্মপ্রেমের সেলফি, উন্নয়নের বরফিতে আর ক্ষমতার জুলফিতেই মজে থাকব!
রোমান দেবতা জানুসের মুখের এক দিক তরুণ শুভ্র, অন্য মুখে অন্ধকার মৃত্যুর ছায়া। যখন এক পোশাকশ্রমিক রেললাইনে পড়ে থাকা শিশুকে বাঁচাতে জীবন দেন, ঠিক তখনই অন্য কোথাও অন্য কোনো যুবকেরা ভয়ংকরভাবে নির্যাতন করে কাউকে হত্যা করছে—এমনকি শিশুদেরও। যে আমরা রানা প্লাজার শ্রমিকদের বাঁচাতে হাজারে হাজারে ছুটে যাই, সেই আমরাই ঈদের দিনে গার্মেন্টসের শ্রমিকদের অনাহার-অনশন থেকে চোখ ফিরিয়ে রাখি।
রসু খাঁকে মনে আছে? একের পর এক নারীকে ধর্ষণের পর খুন করত। ঘটনাটা ছিল এক নৈতিক ভূমিকম্প। ঢাকার আমিনবাজারের কেবলার চরে বেড়াতে যাওয়া ছয় তরুণকে পিটিয়ে হত্যাও বেশি দিন হয়নি। রসু খাঁ এখনো জন্মায়, কেবলার চরও জাগছে এখানে-ওখানে। জিহাদের মতো অতল গর্তে দেশসুদ্ধ পড়ছি তো পড়ছিই। রসু খাঁর বিচার দেখে সমাজের উদরে নৈতিকতার ঢেকুর উঠেছিল। সামিউলের এক খুনি সৌদি আরবে ধরা পড়ায় আরামের হাই উঠেছিল অনেকের। কিন্তু এখন?
যেমন জনগণ তেমন শাসন নাকি তারা পায়। আমাদের সমাজ, মানে আমার-আপনার মনে যে বিষরক্ত, তা-ই জিঘাংসার বিষফোড়া দিয়ে ফেটে বেরোচ্ছে। আস্ত সমাজ যখন সমস্যার মাইনফিল্ড হয়, তখন এখানে ওখানে অমানবিকতার বিস্ফোরণ ঘটবেই। ধর্মবিশ্বাসীরা প্রার্থনায় বলেন, আমাদের ভেতরের শয়তান থেকে মুক্ত করো হে প্রভু। আমাদের ভেতরের শয়তানটাকে সামলানোর জন্য যে বিধিবিধান-প্রতিষ্ঠান গড়া হয়েছিল, যে রাষ্ট্রযন্ত্র বানানো হয়েছিল, তা যখন কাজ করছে না, তখন মুক্তি কে দেবে? মুক্তি আসলে কেউ কাউকে দিতে পারে না, যার বেশি দরকার, সে-ই সেটার জন্য লড়াই করে। আমাদের বোধ হয় তার দরকার নেই, আমাদের আছে ফেসবুক, ক্রিকেট আর শত চ্যানেলের টেলিভিশন।
এটা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা না; এটা অব্যাহত মানবিক বিপর্যয়ের ঢল। এর বিচার কেবল আদালতের দায় না, এর বিচার ও প্রতিকারের ভার সমগ্র সমাজের। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৫৫ সালে এক কৃষ্ণাঙ্গ কালো মায়ের শিশুকে ঘুমন্ত অবস্থায় তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়। সেই মা তারপর রণরঙ্গিনী হয়ে সন্তান হত্যার বিচারে পথে নামেন। আন্দোলন হয়, মানুষ আসে। তারা বিচার করিয়ে নিয়েছিল; বর্ণবাদী আইন সংবিধান থেকে মুছতে বাধ্য করেছিল সরকারকে। খুলনার কিশোর রাকিবের মায়ের ফরিয়াদ: ‘প্রধানমন্ত্রী কি আর আমাগো কথা শুনবে?’
সাম্প্রতিক কালে সংঘটিত এই নৃশংসতার সূত্রপাত ঘটে কুখ্যাত বাংলা ভাইয়ের বাহিনীর হাতে—জঙ্গি বোমায় বহু মানুষকে ছিন্নভিন্ন করার শয়তানি উৎসবে। তারপর ক্রসফায়ার-বন্দুকযুদ্ধ, তারপর নদীতে ভাসমান লাশ, তারপর পেট্রলবোমার নারকীয় উল্লাস। নামতে নামতে তা এখন শিশুদের হত্যায় পর্যবসিত হয়েছে। ফেরাউনের ভয় ছিল নবজাতক শিশু, জীবনবিরোধী অপশক্তির হিংসার লক্ষ্যও শিশুরাই। এই হিংস্রতা হয়তো পরিকল্পিত বা উদ্দেশ্যমূলক না। কিন্তু কোনো এক জায়গায় বাঁধ দিয়ে এটাকে ঠেকানোও যাচ্ছে না। কারণ, এই বর্বরতা আসল অসুখ না, এগুলো অসুখের উপসর্গ।
সব রকম নৃশংসতার জন্ম ‘দুর্বলতা’ থেকে। যে মানুষ তটস্থ, অস্থির, ভীত ও লোভী—সে-ই তো দুর্বল মানুষ। মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড তাঁর মার্নিং অ্যান্ড মেলানকোলিয়ায় যা বলেন, তা আমরা প্রবাদ থেকেও জানতাম যে, অল্প দুঃখে কাতর, অধিক শোকে পাথর। দুঃখ যখন স্থায়ী হয় তখন মানুষ বিষণ্ন হয়ে পড়ে।
গভীর অবসাদ নিয়ে সে চলে-ফেরে বটে, কিন্তু সর্বক্ষণ অনুভব করে কী যেন নেই, কী যেন নেই। শূন্যতার অনুভবে অসুখী হলেও বুঝতে পারে না আসলে কী সে হারিয়েছে। এই দেশ, এই ব্যবস্থায়, এই আগ্রাসী, ভোগী, বিনোদনমত্ত, হিংসাত্মক বাস্তবতায় আমরা হারিয়ে ফেলেছি আমাদের ভেতরের মানুষটাকে। মানুষের বেশে আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি যারা, তারা হলিউডি সিনেমার জোম্বি। জোম্বিরা কবর থেকে উঠে এসে জ্যান্ত মানুষ ধরে খায়। জোম্বিদের আক্রমণে মৃত মানুষেরাও জোম্বি হয়ে যায়। একটি সমাজ, রাষ্ট্র, প্রশাসন নষ্ট ও দায়িত্বহীন হয়ে গেলে এ রকম জোম্বি যুগ নেমে আসে। আমাদের আসল ট্র্যাজেডি এই না যে, মানুষ মরছে। মূল ট্র্যাজেডি এখানেই যে, খারাপ মানুষদের বিষয়ে তথাকথিত ভালো মানুষেরাও নীরব থাকছে।
কীভাবে এ থেকে বেরোনো যাবে? প্রথমত, বিচার হতে হবে, সমাজ-রাষ্ট্র পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষগুলো স্লুইসগেটের কাজ করে। এসব স্লুইসগেট বদল বা সারাতে হবে। কিন্তু কুইনাইন জ্বর সারায়, কুইনাইন সারাবে কে? সেই উপায় না পাওয়াই আজকের আসল বিপদ।
চার্লি চ্যাপলিনের সিটি লাইটস ছবিতে একটা অদ্ভুত পরিস্থিতি আসে। এক বেহদ্দ বোকা লোক লুকাতে গিয়ে হুইসেল বাঁশি গিলে ফেলে। সেটা তার পেটের ভেতর ঝামেলা পাকালে হিক্কার দমক শুরু হয়। হিক্কা ওঠে আর বাঁশির দরজায় বাতাস লাগে। বেচারা যতবার হিক্কা দেয় ততবার পেটের ভেতর হুইসেলটি বেজে ওঠে। বিব্রত সে শব্দটি লুকাতে চায়, বোঝাতে চায় যে যেটা বাজছে সেটা সে নয়, শরীরে ঢুকে পড়া অন্য জিনিস। যা সব ঘটছে তাতে বলা যাবে না যে, এগুলো দুর্ঘটনা অথবা বাজে লোকের কাজ। এত এত যখন ঘটে তখন আর বলবার সুযোগ নেই যে, ‘কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়’।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
0 Comment to "শিশুহত্যা: ‘কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়’!"
Post a Comment