হঠাৎই তাদের পৃথিবীতে বিস্ময়, দুঃখ ও বেদনার ঝোড়ো হাওয়া। সেই হাওয়ায় সবকিছু লন্ডভন্ড। প্রিমিয়ার লিগে দুই মৌসুম নিষিদ্ধ হয়ে ক্লাবের ৫৬ বছরের ইতিহাসে লাগল কালির দাগ।
ফরাশগঞ্জের জন্য এ বড় লজ্জার। অল্প সময়ের মধ্যেই দলটা দেখল সাফল্য আর হতাশায় মোড়ানো মুদ্রার দুটি পিঠ। ২০১১ সালে স্বাধীনতা কাপ জয়, ২০০৮ প্রথম সুপার কাপে প্লেট বিভাগে চ্যাম্পিয়ন—উজ্জ্বল সেই দিন পেরিয়ে হঠাৎই ঘোর দুর্দিন।
কাকতালীয় ঘটনাই, ফরাশগঞ্জের আগের দুটি সাফল্যের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে শেখ রাসেলের নাম। দুটি ফাইনালেই তারা টাইব্রেকারে হারিয়েছিল শেখ রাসেলকে। সেই দলটির সঙ্গেই ৩ আগস্ট খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে নিজেরাই নিজেদের ফেলে দিল চরম বিপদে।
বৃষ্টির জন্য ম্যাচটা দুই দিন হয়নি। তৃতীয় দিন ১৩ মিনিট হতেই শেখ রাসেল পায় পেনাল্টি। সেটিকে কেন্দ্র করে ঘটনার পরম্পরায় রাসেলের কিংসলেকে হলুদ কার্ড দেখান রেফারি। কিন্তু ফরাশগঞ্জ গোঁ ধরে বসে, তাঁকে লাল কার্ড দেখাতে হবে। পাড়ার খেলার মতো এ যেন মামাবাড়ির আবদার! লাল কার্ডের অদ্ভুত দাবিতে ফরাশগঞ্জ আর খেলেইনি!
ফুটবলে ‘রিফিউজড টু প্লে’ গুরুতর অপরাধ। এর কোনো ক্ষমা নেই। বাফুফে তাই চলতি প্রিমিয়ার লিগসহ পরের লিগেও নিষিদ্ধ করেছে ফরাশগঞ্জকে। সঙ্গে ১৮ লাখ টাকা জরিমানা। এই শাস্তিটাও অনেকের কাছে কম মনে হচ্ছে।
ফরাশগঞ্জের খেলোয়াড়েরাও আড়ালে-আবডালে তাতে কণ্ঠ মেলাচ্ছেন। তাঁদের হৃদয়ে অবিরাম রক্তক্ষরণ হচ্ছে। পায়ে বল নেই গত কয়েক দিন ধরে। ক্লাবে পড়ে আছেন, কর্তারা উঁকি দিয়ে একটিবারও জিজ্ঞেস করেননি, ‘তোমরা কী করছ, কী খাচ্ছ, কেমন আছ? ’
ক্লাব তাঁবুটা তাই বিষণ্নতার চাদরে ঢাকা, একেবারেই যেন প্রাণহীন। একটু কান পাতলেই শোনা যায় গুমোট কান্না। কাল বিকেলে সেখানে বসে কর্তাদের অতি বাড়াবাড়ির কথাই অনুযোগের সুরে বলছিলেন একাধিক খেলোয়াড়। বারবারই আসছিল ফুটবল চেয়ারম্যান সেলিম খানের নাম। সেদিন ‘খেলব না’ গোঁ ধরে দলটাকে মাঠ থেকে তুলে নেন ভদ্রলোক। পরে বুঝতে পেরেছেন কাজটা ঠিক হয়নি। এক খেলোয়াড় মজা করে বলেছিলেন, ‘কর্তারা হুজুগে মাতাল তো। খেলব না বলেছেন তো খেললেন না, কিন্তু পরিণতি কী ভাবার দরকার মনে করেননি! ’
অনুশোচনা ছাড়া এখন তাই আর করার কিছু দেখছেন না খেলোয়াড়েরা! সবাই খুব ব্যথিত। সবচেয়ে পুরোনো খেলোয়াড় গোলরক্ষক সুজন চৌধুরী মুষড়ে পড়েছেন। সেদিনের কথা ভুলতেই পারছেন না কিছুতে, ‘আমি সবাইকে বলেছিলাম ভাই খেলেন। কিন্তু খেলা হলো না। মুহূর্তের মধ্যেই সব শেষ।’ আরেক খেলোয়াড় প্রণব দে কণ্ঠ মেলান, ‘আমিও বলেছিলাম, ভাই না খেললে বড় ধরনের সমস্যা হবে।’
যাঁর ফাউলে পেনাল্টি পেয়েছিল শেখ রাসেল, সেই ডিফেন্ডার ফরহাদুজ্জামান বাবু নীরবে অশ্রু ফেলেন। ফুটবল জীবনের শুরুতেই এত বড় একটা দুর্যোগে হতবিহ্বল এই তরুণ। মাঠ থেকে ফিরে সারা রাত ঘুমোতে পারেননি। অস্থির পায়চারি করেছেন। দলের নিষিদ্ধ হওয়ার খবর টিভির স্ক্রলে দেখে প্রায় মূর্ছা যেতে বসেছিলেন, ‘ব্রেকিং নিউজ দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।’
মিডফিল্ডার রিপনও নাকি সে রাতে চোখ দুটি বন্ধ করতে পারেননি। এই খেলোয়াড়দের কক্ষের জানালা খুললেই বুড়িগঙ্গায় নৌকা, লঞ্চ চলাচলের দৃশ্যটা চোখ কাড়ে। কিন্তু সেদিকে আর চোখ যায় না। চার দিন ধরে ক্লাবে পড়ে আছেন। অযত্ন-অবহেলায় দিন কাটাচ্ছেন সেই লালকুঠিতে।
পুরোনো ঢাকার ব্যস্ততম শ্যামবাজারে ফরাশগঞ্জের বিশাল চারতলা ক্লাব ভবন। বাংলাদেশের আর কোনো ক্লাব এত বড় ভবন করতে পারেনি আজও। এটিই একমাত্র ক্লাব, যাদের জিম আছে। সেই ইট-পাথরের দেয়াল বেয়ে যেন নীরব অশ্রুই ঝরছে!
ফরাশগঞ্জের খেলোয়াড়েরা রাস্তায় বেরোলেই প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়, ‘ভাই এটা কী হলো?’ স্থানীয় পান দোকানি আমির হোসেন প্রসঙ্গটা তুলে ফরাশগঞ্জ কর্তাদের মুণ্ডুপাত করলেন, ‘মাঠে খেলমু না বলাটা যে অপরাধ এইডা কী আমাগো কর্তারা জানতেন না! ’
হয়তো জানতেন। কিন্তু ক্ষণিকের নির্বুদ্ধিতার পরিণতিটা হয়তো অনুমান করতে পারেননি!

0 Comment to "লালকুঠিতে গুমরে কাঁদছে ফরাশগঞ্জ"
Post a Comment