ঘরের কাজে অংশগ্রহণে পুরুষদের অনীহার নেপথ্যে হয়তো সামাজিক মনোভাবই বড় কারণ। ২০১৪ সালে অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) জরিপে দক্ষিণ কোরিয়ার পুরুষদের অবস্থান ছিল একেবারেই তলার দিকে। আন্তর্জাতিক সংস্থাটির জরিপে দেখা গেছে, গড়ে দিনে মাত্র ২১ মিনিট সময় ঘরের কাজে ব্যয় করেন সেখানকার পুরুষেরা।
কিন্তু, এখন দিন পাল্টাচ্ছে। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ৫৩ বছর বয়সী লি জিন-সু জানিয়েছেন, নিজে যে একজন কর্তৃত্ববাদী পিতা এবং আধিপত্য ফলানো স্বামী তা উপলব্ধি করেছেন তিনি। তাই নিজেকে শোধরানোর চেষ্টাও শুরু করেছেন লি। আজকাল তাঁর মনে হয়, ‘একটি সুখী পরিবারের জন্য কর্তৃত্বের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন আছে রান্নাবান্নার।’
লি বলেন, ‘আমি নিজেকে বদলাতে চাচ্ছিলাম। রান্নার ক্লাসে যাওয়া শুরু করা এটা সহজ করে দিয়েছে।’
লি এখন প্রতি সপ্তাহেই কাজের শেষে সুখী পুরুষের রান্নার ক্লাসে যান। মাথায় সাদা টুপি আর সাদা অ্যাপ্রোন পরে মাঝ বয়সী অন্যান্য পুরুষদের সঙ্গে মনোযোগ দিয়ে শেখেন রান্নাবান্না। এই তো কদিন আগেই বাড়িতে নিজের স্ত্রী ও স্ত্রীর বন্ধুদের চাইনিজ কোল্ড ভেজিটেবল রেঁধে খাইয়েছেন লি। স্মার্টফোন থেকে খাবার পরিবেশনের সেই ছবিও বের করে দেখালেন তিনি।
জনসংখ্যার বিন্যাস আর হালের জন-সংস্কৃতিও দক্ষিণ কোরিয়ার পুরুষদের এ মনোভাব পরিবর্তনে সাহায্য করছে। দিন দিন অনেক বেশি সংখ্যায় নারীরা নানা পেশায় সাফল্য পাচ্ছেন। আর নানা শিল্পে নারীদের চাহিদাও অনেক বেড়ে গেছে। ফলে ঘরে থাকা নারীর সংখ্যাও কমে গেছে। তাই পুরুষদেরও আর রান্না না করে থাকার উপায় থাকছে না।
টেলিভিশনের রিয়েলিটি শোতেও এখন পুরুষদের রান্নার অনুষ্ঠান প্রচার হচ্ছে। অন্য অনেক দেশের মতোই দক্ষিণ কোরিয়াতেও তারকা খ্যাতি পাওয়া পাচকদের অনেকেই পুরুষ। আর এই পাচকেরাও অনেক পুরুষকে রান্নাবান্নায় উৎসাহিত করছেন। অনলাইন কেনাকাটার সাইট জি-মার্কেট জানিয়েছে, রান্নাঘরের তৈজসপত্রের ক্রেতা হিসেবে পুরুষের সংখ্যা সম্প্রতি প্রায় ২৪ শতাংশ বেড়ে গেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সমাজে পুরুষতান্ত্রিকতা কতটা প্রবল তা বোঝা যায় দেশটির প্রবাদ প্রবচনেও। এক সময় ঘরের কাজে বা রান্নাবান্নায় হাত লাগালে যেন পুরুষত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠত! এমনই এক প্রবাদ আছে যেখানে বলা হয়েছে— ‘হেঁশেলে যাবে যে অপগণ্ড, সেই হারাবে তার অণ্ড।’ তবে, দিন পাল্টানোর প্রমাণ দিয়ে জনপ্রিয় পাচক হ্যান হি-ওন বলছেন ভিন্ন কথা। রাজধানী সিউলে ২০১২ সাল থেকে কেতাদুরস্ত ‘হ্যাপি গাইস কুকিং ক্লাস’ বা সুখী পুরুষের রান্নার ক্লাস’ পরিচালনাকারী এই পাচক জানান, ‘আজকাল তরুণেরা বলছে: রান্না না করতে পারলে তুমি বিয়েই করতে পারবে না।’
0 Comment to "সুখী পুরুষের রান্নার ক্লাস!"
Post a Comment